HEADER ADD

প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ

                                                                                                           

  প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ

সকাল ৬টা ৩০ মিনিট, মোবাইলের অ্যালার্মটা হঠাৎ করেই বেজে উঠল। অ্যালার্মের শব্দ থামানোর আগেই পাশ থেকে ভেসে এলো আমার স্ত্রীর সেই চিরচেনা ডাক— "এই, ওঠো! সকাল হয়ে গেছে। জান্নাতকে নিয়ে স্কুলে যেতে হবে।" প্রতিদিনের মতো একই কথা, একই সুর। তবুও এই ডাকের মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত ভালোবাসা, এক টুকরো দায়িত্ববোধ।


ভোরের দিকে একটু বৃষ্টি হয়েছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা শীতল বাতাস শরীরটাকে আরও অলস করে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আহা! যদি আর দশ মিনিট ঘুমানো যেত!

কিন্তু বাবা হওয়ার একটা বড় সমস্যা হলো— নিজের ইচ্ছার আগে সন্তানের দায়িত্ব এসে দাঁড়ায়।

ভাবলাম, "না, আর ঘুমালে চলবে না। জান্নাতের স্কুলের সময় মিস হয়ে যাবে।"

অগত্যা বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লাম। ব্রাশ, শেভ আর গোসল—সব মিলিয়ে প্রায় আধাঘণ্টা কেটে গেল।

বেরিয়ে দেখি, ডাইনিং টেবিলে সকালের নাস্তা সুন্দর করে সাজানো। নাস্তা শেষ করতেই আমার স্ত্রী এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা এনে সামনে রাখল।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে প্রথম চুমুকটা দিতেই মনে হলো, দিনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা বুঝি এটাই।চা শেষ করে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকালাম।সকাল ৭টা ৩০ মিনিট।এবার আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না।শুরু হলো প্রতিদিনের সেই চেনা জীবনযুদ্ধ।
আমার একমাত্র মেয়ে “জান্নাত”। বয়স মাত্র এগারো বছর। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট্ট হলেও দায়িত্ববোধটা বেশ ভালো।
আমি ডাক দিলাম—"মা, স্কুল ব্যাগটা নাও। চলো, দেরি হয়ে যাবে।"
মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সে দরজায় এসে দাঁড়াল।
এদিকে তার মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে আমাদের বিদায় জানাচ্ছে। প্রতিদিনের এই দৃশ্যটা যেন আমাদের ছোট্ট সংসারের এক নীরব রীতি।
আমি আর জান্নাত একসঙ্গে বললাম—
"বাই!" সেও মুচকি হেসে হাত নাড়ল।
বাবা-মেয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
রাতের বৃষ্টিতে রাস্তার ধুলো ধুয়ে গেছে। চারপাশে ভেজা মাটির মিষ্টি গন্ধ। গাছের পাতায় তখনও বৃষ্টির ফোঁটা ঝুলে আছে। সকালটা যেন নতুন করে জন্ম নিয়েছে।
কিছুদূর হেঁটে মেইন রোডে এসে দাঁড়ালাম। অফিসগামী মানুষ, স্কুলের শিক্ষার্থী আর যানবাহনের ব্যস্ততা তখন ধীরে ধীরে বাড়ছে।আমি ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত তুলে একটার পর একটা সিএনজিকে ইশারা করতে লাগলাম।
ভাই, যাবেন? কয়েকটা সিএনজি পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তারপর একটি সবুজ সিএনজি আমাদের সামনে এসে থামল।
ড্রাইভার হেসে বললেন — কোথায় যাবেন ?
গন্তব্য বলতেই তিনি মাথা নেড়ে বললেন — উঠে বসেন।
আমি আর জান্নাত পাশাপাশি বসে পড়লাম।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম জান্নাতের স্কুলে। স্কুল মার্কেটেই আমার ছোট্ট কম্পিউটারের দোকানে।দোকানে মালামাল বলতে তেমন কিছু নেই। আছে দুইটি কম্পিইটার ,প্রিন্টার আর একটি পুরোনো ফটোকপির মেশিন, যা দিয়ে আমি প্রতিদিন রোজগার করি।
দোকানটা ছোট হলেও এটাই আমার স্বপ্ন, আমার সংসারের ভরসা। এখান থেকেই পরিবারের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের হিসাব মেলে।

আমার দোকানের ঠিক পেছনেই “ফেনী শিশু নিকেতন কালেক্টরেট স্কুল”। তাই প্রতিদিন জান্নাতকে স্কুলের গেইটের ভেতর ঠুকিয়ে দিয়ে আমি এসে দোকান খুলে বসি।

দোকানের পাশেই আলমের চায়ের দোকান।সে খুভ ভালো মসলা দিয়ে চা বানায়।

আমি শাটার তুলতেই আলম দূর থেকে হেসে বললো— "মামা, আজও স্পেশাল এক কাপ চা হবে তো?"

আমি হেসে উত্তর দিলাম— "অবশ্যই।তোর চা না খেলে তো কম্পিউটারও ঠিকমতো চলে না!" চারপাশে সবাই হেসে উঠল।

জান্নাত তখন স্কুলের গেটের দিকে হাঁটছে। হঠাৎ একবার পেছনে ফিরে হাত নাড়ল।

আমি মুচকি হেসে হাত নাড়লাম।

মেয়েটা স্কুলের ভেতরে ঢুকে যেতেই বুকের ভেতর একটা শান্তি নেমে এলো।

এবার দোকানের চেয়ারটায় বসে কম্পিউটার চালু করলাম।

বাইরে আলমের চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠেছে, আর আমি মনে মনে ভাবলাম— “জীবনটা আসলে খুব বড় কিছু নয়। ছোট ছোট দায়িত্ব, এক কাপ গরম চা, মেয়ের হাসিমুখ আর পরিবারের ভালোবাসাই একজন বাবার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

প্রতিটি সকাল তাই আমার কাছে শুধু একটি নতুন দিন নয়; এটি একজন বাবা, একজন স্বামী এবং একজন ছোট ব্যবসায়ীর নতুন করে শুরু করার গল্প। এখানেই আমার সুখ, এখানেই আমার জীবন।

মোহাম্মদ ফজলুল করিম (ফরহাদ)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ