HEADER ADD

মেঘের ডানায় এক মুঠো প্রেম

মেঘের ডানায় এক মুঠো প্রেম

মোহাম্মদ ফজলুল করিম (ফরহাদ)

আকাশের মুখটা সকাল থেকেই ভার ধূসর মেঘেরা দল বেঁধে সারা শহরের ওপর জাঁকিয়ে বসেছে যেকোনো মুহূর্তে ঝুমঝুমিয়ে নামবে বৃষ্টি এমন দিনে মনটা এমনিতেই একটু উড়ুউড়ু করে, আর সেই মনকে আরও খানিকটা দোলা দিতে নীলু এসে দাঁড়াল তার ফ্ল্যাটের বারান্দায় হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা এলাচ চা

নীলুর জীবনটা ইদানীং বড্ড বেশি নিয়ম মেনে চলে। ঘড়ির কাঁটা ধরে অফিস, ফাইল আর ল্যাপটপের স্ক্রিন। কিন্তু এই মেঘলা দিনটা যেন তাকে এক ঝটকায় তার চেনা ব্যস্ততা থেকে দূরে সরিয়ে দিল

ঠিক তখনই পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়াল আবির। নীলু আর আবির একই ফ্লোরের মুখোমুখি দুটো ফ্ল্যাটে থাকে মাস ছয়েক হলো। হাই-হ্যালো বা লিফটে দেখা হলে মৃদু হাসির বিনিময় ছাড়া তাদের মধ্যে তেমন কোনো কথা হয়নি। আবির পেশায় একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। একটু অন্তর্মুখী, কিন্তু তার চোখের মধ্যে একটা গভীর শান্ত ভাব আছেআজ আবিরের পরনে একটা হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি। বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে আবিরও আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল

নীলু চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে তাকাল। আবির হঠাৎ চোখ ফেরাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। নীলু একটু ইতস্তত করে হেসেই ফেলল

"দারুণ আবহাওয়া, তাই না?" আবিরই প্রথম নীরবতা ভাঙল। তার গলাটা বেশ চমৎকার, যেন এই মেঘলা দিনের সাথে একদম মানিয়ে যায়। "হ্যাঁ, ভীষণ সুন্দর। মনে হচ্ছে যেন মেঘেরা সব ধুলোবালি ধুয়ে দিতে এসেছে," নীলু বলল"এমন দিনে এক কাপ চা আর ভালো একটা গান ছাড়া আর কিছু জমে না," আবির মুচকি হেসে বললনীলু নিজের চায়ের কাপটা একটু উঁচিয়ে দেখিয়ে বলল, "চা তো আমার তৈরি। কিন্তু গান কোথায়?" আবির একটু ভাবল। তারপর বলল, "একটু অপেক্ষা করুন।" সে ঘরের ভেতর চলে গেল এবং মিনিটখানেক পর তার হাতে একটা অ্যাকোস্টিক গিটার। বারান্দার একটা টুলে বসে সে গিটারের তারে আলতো করে আঙুল ছোঁলাল।

টুংটাং শব্দে চারপাশের মেঘলা পরিবেশটা যেন এক মায়াবী রূপ নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ ভেঙে নামল বৃষ্টি। বড় বড় ফোঁটায় জানলা-বারান্দা ভিজে যেতে লাগল। বৃষ্টির সেই সোঁদা গন্ধ আর শব্দের মাঝেই আবির গিটার বাজিয়ে গাইতে শুরু করল রবীন্দ্রনাথের সেই চিরচেনা গান"এমন দিনে তারে বলা যায়..." আবিরের গায়কি প্রফেশনাল গায়কদের মতো নয়, কিন্তু তার গলায় এমন একটা অদ্ভুত আন্তরিকতা ছিল যে নীলু মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টির কিছু ছাট এসে নীলুর চুলে, মুখে এসে পড়ছিল, কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। সে শুধু দেখছিল আবিরকেযে অবলীলায় গান গাইতে গাইতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে

গান শেষ হতেই নীলু হাততালি দিয়ে উঠল, "অসাধারণ! আপনি এত সুন্দর গান গাইতে পারেন, আগে তো জানতাম না!" আবির একটু লাজুক হেসে বলল, "শুধু বিশেষ বিশেষ দিনেই গলাটা একটু খোলে। আচ্ছা, বৃষ্টি তো বেশ জমে উঠেছে। এই বৃষ্টিভেজা দুপুরে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা হলে কেমন হতো?" নীলু হেসে ফেলল, "আদর্শ হতো। কিন্তু একা একা কি আর রাঁধতে ইচ্ছে করে?" আবির একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, "তাহলে এক কাজ করলে কেমন হয়? আমার কাছে চাল-ডাল সব আছে, আর ফ্রিজে ইলিশ মাছও আছে। আপনি যদি একটু রান্নার দিকটা সামলান, আমি বাকি সব জোগাড় করে দেব দুজন প্রতিবেশী মিলে না হয় আজকের দিনটা উদযাপন করি?"

নীলু প্রথমে একটু চমকে গেল, তারপর ভাবলজীবনটা তো এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর জন্যই সুন্দর। সবসময় এত নিয়ম মেনে চলার কী দরকার? সে হেসে বলল, "প্রস্তাবটা মন্দ না। তবে একটা শর্ত আছে।" "কী শর্ত?" আবির উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল"রান্না করার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনাকে আরও অন্তত তিনটে গান শোনাতে হবে।" "হান্ড্রেড পার্সেন্ট মঞ্জুর!" আবির চওড়া হাসলবিকেলের দিকে যখন বৃষ্টিটা একটু কমে এল, তখন মেঘলা আকাশের আলো-ছায়ার মাঝে আবিরের ডাইনিং টেবিলে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির সুবাস। তারা শুধু খাবারই ভাগ করে নিল না, ভাগ করে নিল তাদের ছোটবেলার বৃষ্টির দিনের গল্প, পছন্দের বই আর না বলা অনেক জমানো কথাজানলার বাইরে তখনো টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা এক অদ্ভুত ওম আর নতুন এক বন্ধুত্বের (কিংবা হয়তো তার চেয়েও বেশি কিছুর) আলোয় ভরে উঠেছেদিন শেষে নীলু যখন নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এল, তখন তার মনটা এক অদ্ভুত শান্তিতে মেতে আছে। সে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। মেঘলা দিনটা আর মোটেও ধূসর লাগছে না, বরং তার জীবনের ক্যানভাসে যেন এক মুঠো নতুন রঙ এনে দিয়েছে

মোবাইলে একটা মেসেজ টোন বেজে উঠল। আবিরের মেসেজ"পরের মেঘলা দিনটার জন্য এখন থেকেই অপেক্ষা করছি।" নীলু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আপনমনেই হাসল। সত্যি, কিছু মেঘলা দিন জীবনে ভীষণ সুন্দর রোদ নিয়ে আসে

 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ