HEADER ADD

সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা নয়, করের আওতা সম্প্রসারণই হোক রাষ্ট্রীয় নীতি...

 

সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা নয়, করের আওতা সম্প্রসারণই হোক রাষ্ট্রীয় নীতি...

প্রতিবছরের মতো জুন মাস এলেই জাতীয় বাজেট নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান কর বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায় এবং সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, জনগণের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে করের আওতা বৃদ্ধি করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। বাংলাদেশে এখনও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা নিয়মিত আয় করলেও কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। তাদের করের আওতায় আনতে পারলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই আয় ও লেনদেনের সঠিক হিসাব কর কর্তৃপক্ষের আওতায় আসে না। ফলে একদিকে নিয়মিত করদাতারা কর দিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে অনেকেই কর প্রদান না করেই ব্যবসা ও সম্পদের পরিধি বৃদ্ধি করছেন। এতে কর ব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শহর ও বন্দর এলাকায় বিপুলসংখ্যক রিকশা পরিচালিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব রিকশার মালিক একাধিক রিকশার মালিকানা ভোগ করেন এবং এ খাত থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করেন। একইভাবে মাংস ব্যবসা, পাইকারি ও খুচরা কৃষিপণ্য ব্যবসা, বিভিন্ন সেবা খাত এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অনেক অংশে বড় অঙ্কের লেনদেন হলেও তা সবসময় কর ব্যবস্থার আওতায় আসে না।

এছাড়া কিছু পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী তাদের প্রকৃত আয়ের তুলনায় কম আয় প্রদর্শন করে কর ফাঁকির সুযোগ গ্রহণ করেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, ব্যাংকিং লেনদেন পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল নিবন্ধন এবং স্বচ্ছ হিসাব ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তবে করের আওতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন—যারা প্রকৃত অর্থেই নিম্ন আয়ের মানুষ, তাদের ওপর কোনোভাবেই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ বা জীবিকার তাগিদে ছোট পরিসরে কাজ করা ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই কর নীতি প্রণয়ন করতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত উচ্চ আয়ের কিন্তু করের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ন্যায্য রাজস্ব আদায়।

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কর অপরিহার্য। কিন্তু সেই কর ব্যবস্থা হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে নয়, বরং কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং নতুন করদাতা সৃষ্টির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি করা গেলে সরকার যেমন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে, তেমনি জনগণও স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারবে।

অতএব, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত সময়ের দাবি। এতে দেশ এগিয়ে যাবে, রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়বে এবং জনগণের জীবনও হবে আরও স্বস্তিদায়ক।

Referral link

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ