প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ (২য় পর্ব )
সকাল
৮টা
বাজতে
না
বাজতেই
ফেনী
শিশু
নিকেতন
কালেক্টরেট স্কুলের প্রাঙ্গণ মুখর
হয়ে
উঠল
শিশুদের কোলাহলে। ছোট
ছোট
পা,
কাঁধে
রঙিন
ব্যাগ,
মুখে
একরাশ
হাসি
আর
চোখে
শত
স্বপ্ন
নিয়ে
একের
পর
এক
শিক্ষার্থী স্কুলের গেট
পেরিয়ে
ভেতরে
প্রবেশ
করছে।
তাদের
ভিড়ের
মধ্যেই
ছিল
আমার
একমাত্র মেয়ে-জান্নাত।
হয়তো
পৃথিবীর সব
বাবা-মায়ের চোখের ভাষা
একই
রকম।
জান্নাত হঠাৎ
একবার
পেছনে
ফিরে
আমার
দিকে
তাকাল।
তারপর
মিষ্টি
করে
হেসে
হাত
নেড়ে
বলল,
"আব্বু,
তুমি
দোকানে
যাও।
স্কুল
শেষ
হলে
দেখা
হবে।"
আমি
হাসিমুখে হাত
নাড়লাম। কিন্তু
সত্যি
বলতে
কী,
আমার
শরীরটা
দোকানের দিকে
গেলেও
মনটা
যেন
ওর
সঙ্গেই
স্কুলের ভেতরে
ঢুকে
গেল।
জান্নাত ধীরে
ধীরে
তার
ক্লাসরুমে প্রবেশ
করল।
ঢুকেই
সে
তার
প্রিয়
বান্ধবী আদিবার
পাশে
গিয়ে
বসল।
আদিবা
শুধু
তার
বান্ধবীই নয়,
তার
ভাগ্নীও বটে।
তাই
দুজনের
মধ্যে
বন্ধুত্বের পাশাপাশি রয়েছে
আত্মীয়তারও এক
গভীর
বন্ধন।
কিছুক্ষণ পর
স্কুলের ঘণ্টা
বেজে
উঠল।
মুহূর্তেই পুরো
স্কুল
যেন
শৃঙ্খলার এক
আবহে
ঢেকে
গেল।
সবাই
দাঁড়িয়ে জাতীয়
সংগীত
গাইতে
শুরু
করল—
"আমার সোনার
বাংলা,
আমি
তোমায়
ভালোবাসি..."
শত
শত
কোমল
কণ্ঠের
সম্মিলিত সেই
সুরে
পুরো
স্কুল
প্রাঙ্গণ এক
অন্যরকম আবেগে
ভরে
উঠল।
স্কুল
গেটের
বাইরে
দাঁড়িয়ে থাকা
অভিভাবকেরাও নীরবে
সেই
গান
শুনছিলেন। অনেকের
ঠোঁট
নীরবে
নড়ে
উঠছিল।
মনে
হচ্ছিল,
তারাও
যেন
গানের
সঙ্গে
গলা
মিলিয়ে
গাইছেন।
সত্যি
বলতে
কী,
এই
কয়েকটি
মুহূর্তে প্রতিটি বাবা-মায়ের বুকের ভেতর
দেশের
প্রতি
এক
অন্যরকম ভালোবাসার জন্ম
হয়।
জাতীয়
সংগীত
শেষ
হওয়ার
পর
শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ
করলেন
ম্যাম।
হাতে
থাকা
ডাস্টারটি টেবিলের ওপর
আলতো
করে
চাপড়
দিয়ে
বললেন,
"বাচ্চারা, সাইলেন্ট প্লিজ।"
মুহূর্তেই পুরো
ক্লাস
নীরব
হয়ে
গেল।
প্রথম
ক্লাস
ছিল
বাংলা। শিক্ষক
আজ
পরিশ্রম, সততা
ও
ভালোবাসার ওপর
একটি
গল্প
পড়াচ্ছিলেন। জান্নাত মনোযোগ
দিয়ে
শিক্ষকের প্রতিটি কথা
শুনছিল। মাঝে
মাঝে
খাতায়
ছোট
ছোট
নোটও
লিখে
নিচ্ছিল।
এদিকে
আমি
আমার
ছোট
কম্পিউটারের দোকানের সাঁটার
খুলে
দোকানে
বসলাম।
কম্পিউটার চালু
করে
অনলাইন
পত্রিকা পড়তে
শুরু
করলাম।
সকাল
আটটার
দিকে
তেমন
কোনো
কাস্টমার থাকে
না।
করোনার
পর
থেকে
মানুষজন অনেক
দেরিতে
ঘুম
থেকে
ওঠে,
দেরিতে
দোকানপাট খোলে।
তাই
এই
সময়টায়
একটু
অবসরই
পাওয়া
যায়।
কম্পিউটার স্ক্রিনে সংবাদপত্রের শিরোনামগুলো দেখতে
দেখতে
হঠাৎ
ছোটবেলার কথা
মনে
পড়ে
গেল।
তখন
প্রায়ই
বিকেলে
সরকারি
পাঠাগারে গিয়ে
বিভিন্ন পত্রিকা পড়তাম।
এখন
আর
মানুষ
তেমন
পত্রিকা কেনে
না।
ফেসবুকের যুগে
সবাই
যেন
মোবাইলের স্ক্রিনেই আটকে
গেছে।
ঘড়ির
দিকে
তাকিয়ে
দেখি
সকাল
৯টা
বেজে
গেছে।
এবার
আমার
ছেলে
ফাহিমকে স্কুলে
আনার
সময়
হয়েছে।
ফাহিম
নার্সারি শ্রেণিতে পড়ে
এবং
সেও
ফেনী
শিশু
নিকেতন
কালেক্টরেট স্কুলের ছাত্র।
আমি
তাড়াতাড়ি বাসার
দিকে
রওনা
দিলাম।
বাসার
সামনে
পৌঁছাতেই দেখি,
ফাহিম
স্কুলব্যাগ কাঁধে
নিয়ে
দরজার
সামনে
দাঁড়িয়ে আছে।
আমাকে
দেখেই
সে
আনন্দে
বলে
উঠল,
"মা,
বাবা
এসেছে!"
আমি
আর
দেরি
করলাম
না।
ফাহিমকে নিয়ে
স্কুলের উদ্দেশ্যে বের
হয়ে
গেলাম।
পথে
যেতে
যেতে
সে
নানা
প্রশ্ন
করতে
লাগল—কখন ছুটি হবে,
আজ
কী
পড়ানো
হবে,
টিফিনে
কী
আছে।
তার
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর
দিতে
দিতে
কখন
যে
স্কুলের গেটে
পৌঁছে
গেছি,
বুঝতেই
পারিনি।
ফাহিমকে স্কুলের ভেতরে
ঢুকিয়ে
দিয়ে
আমি
আবার
দোকানে
ফিরে
এলাম।
এদিকে
জান্নাতের দ্বিতীয় ক্লাস
ছিল
বিজ্ঞান। শিক্ষক
খুব
সুন্দরভাবে পাঠদান
করছিলেন। হঠাৎ
তিনি
বোর্ডে
একটি
কঠিন
প্রশ্ন
লিখে
বললেন,
"কে
পারবে
এর
উত্তর
দিতে?"
কিছুক্ষণ পুরো
ক্লাস
নীরব।
ঠিক
তখনই
জান্নাত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে
হাত
তুলে
দাঁড়িয়ে গেল।
কারণ
সে
উত্তরটি জানত।
সে
সুন্দরভাবে প্রশ্নের উত্তর
দিল।
মুহূর্তেই পুরো
ক্লাস
হাততালিতে মুখর
হয়ে
উঠল।
শিক্ষকের মুখেও
ফুটে
উঠল
প্রশংসার হাসি।
এরই
মধ্যে
টিফিনের ঘণ্টা
বেজে
উঠল।
যেন
পুরো
স্কুলে
ছোট্ট
এক
উৎসব
শুরু
হয়ে
গেল।
কেউ
মাঠে
ছুটে
গেল,
কেউ
বন্ধুদের সঙ্গে
গল্পে
মেতে
উঠল।
জান্নাত তার
টিফিন
বক্স
খুলে
বন্ধুদের সঙ্গে
ভাগাভাগি করে
খেতে
লাগল।
তার
মায়ের
হাতে
তৈরি
পরোটা
আর
ডিমভাজি বন্ধুদের কাছেও
বেশ
জনপ্রিয়। খেতে
খেতে
তারা
নিজেদের ছোট্ট
পৃথিবীর নানা
গল্পে
মেতে
উঠল।
টিফিন
শেষে
শুরু
হলো
খেলাধুলার সময়।
স্কুলের মাঠজুড়ে ছড়িয়ে
পড়ল
শিশুদের হাসি,
দৌড়ঝাঁপ আর
আনন্দের কোলাহল। সত্যি
বলতে,
শিশুদের হাসির
শব্দের
চেয়ে
সুন্দর
কোনো
সুর
পৃথিবীতে আছে
বলে
আমার
মনে
হয়
না।
এদিকে
আমি
আমার
ছোট্ট
দোকানে
বসে
কাজ
করছিলাম। দোকানের ঠিক
পেছনেই
তো
জান্নাতদের স্কুল।
মাঝেমধ্যে স্কুলের ঘণ্টার
শব্দ
ভেসে
আসছিল।
প্রতিটি ঘণ্টা
যেন
আমাকে
মনে
করিয়ে
দিচ্ছিল—আমার
সন্তানরা ধীরে
ধীরে
বড়
হয়ে
উঠছে।
আমি
পাশের
চায়ের
দোকানে
বসে
থাকা
আলমকে
ডাক
দিলাম,
"আলম,
এক
কাপ
চা
দাও
তো।"
সে
দূর
থেকে
হাসতে
হাসতে
উত্তর
দিল,
"মামা,
চা
দিচ্ছি!"
কিছুক্ষণের মধ্যেই
ধোঁয়া
ওঠা
এক
কাপ
চা
আমার
সামনে
এসে
গেল।
আজ
আলমের
দোকানেও বেশ
ভিড়।
কেউ
চা
খাচ্ছে,
কেউ
সিগারেট হাতে
দিনের
কর্মপরিকল্পনা করছে।
সবার
চোখে-মুখে যেন একটাই
কথা
লেখা—
"থামলে চলবে
না।
স্বপ্নকে সত্যি
করতে
হলে
সামনে
এগিয়ে
যেতেই
হবে।"
ঠিক
তখনই
আমার
মোবাইল
ফোন
বেজে
উঠল।
স্ক্রিনে তাকিয়ে
দেখি,
জান্নাতের মা
ফোন
করেছে।
ফোন
ধরতেই
তিনি
বললেন,
"বাজারে
যেতে
হবে।
ফ্রিজে
মাছ-মাংস কিছুই নেই।"
কথাটা
শুনে
বুকের
ভেতরটা
হঠাৎ
ধক
করে
উঠল।
বাজারের বর্তমান অবস্থা
মনে
পড়তেই
মাথার
ভেতর
হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে
গেল।
আমি
শান্ত
গলায়
বললাম,
"আচ্ছা, যাচ্ছি।"
তিনি
আবার
বললেন,
"তাড়াতাড়ি যাও,
না
হলে
জান্নাতের আবার
ছুটি
হয়ে
যাবে।"
চায়ের
কাপে
শেষ
চুমুক
দিতে
দিতে
আমি
ভাবছিলাম—সংসার
নামের
এই
ছোট্ট
নৌকাটা
চালিয়ে
নিতে
কত
হিসাব,
কত
চিন্তা,
কত
স্বপ্ন
আর
কত
না
বলা
কষ্ট
বুকের
ভেতর
লুকিয়ে
রাখতে
হয়!
বাজার
করে
দোকানের সামনে
ফিরে
আসতেই
স্কুলের শেষ
ঘণ্টা
বেজে
উঠল।
কিছুক্ষণ পর
শত
শত
শিক্ষার্থীর ভিড়ের
মধ্যে
আমি
আমার
জান্নাতকে দেখতে
পেলাম।
তার
মুখভর্তি হাসি,
চোখে
আনন্দের ঝিলিক।
একটু
পরেই
ছোট্ট
ফাহিমও
দৌড়ে
এসে
আমার
হাত
ধরে
দাঁড়াল।
জান্নাত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে
বলল,
"আব্বু! আজ
আমি
বিজ্ঞান ক্লাসে
সবার
আগে
উত্তর
দিয়েছি!"
আমি
তার
মাথায়
হাত
রেখে
বললাম,
"মাশাআল্লাহ! আমার
মা
তো
অনেক
ভালো
করছে।"
ফাহিম
তখন
পাশে
দাঁড়িয়ে বলল,
"বাবা, আমিও
আজ
ক্লাসে
কবিতা
বলেছি!"
আমি
ওর
মাথায়ও
হাত
রেখে
হাসলাম।
তারা
দুজনেই
হাসল।
আর
সেই
মুহূর্তে আমি
বুঝতে
পারলাম—একজন বাবার জীবনের
সবচেয়ে
বড়
সাফল্য
নিজের
অর্জনে
নয়;
বরং
সন্তানের ছোট
ছোট
সফলতার
মুহূর্তগুলোতে।
সেদিন
আকাশটা
খুব
সুন্দর
ছিল।
হয়তো
আকাশও
জানত,
একজন
বাবার
সবচেয়ে
বড়
সুখের
নাম—তার সন্তানের হাসিমুখ।
আর
এভাবেই
শেষ
হলো
জান্নাত ও
ফাহিমের স্কুলের আরেকটি
দিন;
যে
দিনের
আনন্দ,
গর্ব,
দায়িত্ব আর
ভালোবাসা একজন
বাবার
হৃদয়ে
চিরকাল
বেঁচে
থাকবে।

0 মন্তব্যসমূহ