দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী আজ চরম অর্থনৈতিক চাপে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, চিনি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সংসার চালানো যেন এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারে অস্থিরতা এখন নিত্যদিনের
খবর। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে
চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ বিভিন্ন দেশ
থেকে পণ্য আমদানি করা হলেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম কমছে না। বর্তমানে খুচরা বাজারে
প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়।
ব্যবসায়ীদের মজুতদারি ও কৃত্রিম
সংকট তৈরির মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। দাম বাড়ানোর অজুহাত খুঁজতে ব্যবসায়ীরা নানা
কারণ দেখাচ্ছেন। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কার্যক্রম দৃশ্যমান
নয়। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বাজারে অরাজকতার কারণে সাধারণ
মানুষ এখন আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না। অনেকে বাধ্য হচ্ছেন একবেলা খাবার কমাতে,
সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করতে কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকতে। ভোক্তা অধিকার
সংস্থা ক্যাবের তথ্যমতে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায়
১০ শতাংশ।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহন—সব
ক্ষেত্রেই বেড়েছে ব্যয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ধরনের মাছের দাম
বেড়েছে গড়ে ১৮ শতাংশ। সবজির দামও ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত
শ্রেণির সংসারের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে একজন
সরকারি চাকরিজীবী, গার্মেন্টস শ্রমিক কিংবা রিকশাচালক—সবার অবস্থাই প্রায় একই। আগে
যে পরিবার ১০-১৫ হাজার টাকায় সংসার চালাতে পারত, এখন তাদের মাসিক খরচ দাঁড়িয়েছে ১৫-২০
হাজার টাকার ওপরে, অথচ আয় আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের
নানা উদ্যোগ থাকলেও সাধারণ মানুষ তেমন সুফল পাচ্ছে না। টিসিবির ট্রাকসেল বা রেশন কার্ড
কার্যক্রমে দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ বহুদিনের। প্রকৃত দরিদ্ররা যেখানে সহায়তা পাওয়ার
কথা, সেখানে অনেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সীমিত সরবরাহে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকেই
খালি হাতে ফিরছেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২৭.৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাবকে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, অতি দারিদ্র্যের হারও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এখন দেশে প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ এখন এমনভাবে গড়ে উঠছে, যা বিত্তবান শ্রেণিকে আরও বিত্তবান করছে, কিন্তু নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভাগ্যে তাতে কোনো আলোর রেখা নেই। প্রতিদিনের খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে কোটি মানুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার ব্যবস্থাকে
টেকসই ও জনমুখী করতে হলে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। কার্যকর
বাজার তদারকি, ভোক্তা অধিকার রক্ষা, এবং সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের
লাগাম টানা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সাধারণ মানুষের এমন
সংকটময় অবস্থায় পড়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে অপ্রত্যাশিত। এখনই যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া
হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলীন হয়ে যাবে, আর নতুন করে সৃষ্টি হবে
দারিদ্র্যের এক ভয়ংকর বলয়।

0 মন্তব্যসমূহ