ছয় বছর পর ঢাকসু নির্বাচন-২০২৫:ক্যাম্পাসে উৎসব মুখর পরিবেশ
২০২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ঢাকসু) নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আজ এক অনন্য উত্তেজনা ও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। দীর্ঘ ছয় বছর পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে ব্যানার, পোস্টার, শ্লোগান ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রচারণা শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। শতবর্ষী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ঢাকসু নির্বাচন সবসময়ই ছাত্ররাজনীতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম বড় উৎসব হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ছয় বছর ধরে নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এই প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অবশেষে নতুন করে নির্বাচন হওয়ায় তারা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন হলে আজ সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। প্রতিটি কেন্দ্রে দেখা যাচ্ছে উৎসাহী মুখ, হাতে ভোটার স্লিপ, মুখে হাসি। মেয়েরা, ছেলেরা সবাই সমানভাবে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম এবং শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ভোটগ্রহণ চলছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। ভোটকেন্দ্রের বাইরে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদের প্রতীক সম্বলিত ব্যাজ, রঙিন ফেস্টুন ও গানের মাধ্যমে সমর্থকদের উজ্জীবিত করছেন। কেউ আবার স্লোগান দিচ্ছেন, কেউবা হাত মেলাচ্ছেন ভোটারদের সঙ্গে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও বাম ছাত্র সংগঠনসহ স্বাধীন প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের মুখে শোনা যাচ্ছে নানা প্রত্যাশার কথা। কেউ চান ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হোক, কেউ চান আবাসন, লাইব্রেরি, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান। অনেকের মতে, ঢাকসু শুধু রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একটি বলিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। তাই এবারের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, এ নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করবে। তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর হলেও শিক্ষার্থীরা ভোটের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নিতে পারছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এবারই প্রথম আবাসিক হলের বাইরে ডাকসু ও হল সংসদের ভোট গ্রহণ হচ্ছে। ক্যাম্পাসের নির্ধারিত ৮টি কেন্দ্রে (৮১০টি বুথ) শিক্ষার্থীরা ভোট দেবেন। কার্জন হল কেন্দ্রে ভোট দেবেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, ফজলুল হক মুসলিম হল ও অমর একুশে হলের শিক্ষার্থীরা (৫ হাজার ৭৭ ভোট)। শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রটি নির্ধারণ করা হয়েছে জগন্নাথ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থীদের জন্য (৪ হাজার ৮৫৩ ভোট)। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) ভোট দেবেন রোকেয়া হলের ছাত্রীরা (৫ হাজার ৬৬৫ ভোট)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব কেন্দ্রে ভোট দেবেন বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের শিক্ষার্থীরা (৪ হাজার ৭৫৫ ভোট)। স্যার এ এফ রহমান হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থীরা ভোট দেবেন সিনেট ভবন কেন্দ্রে (৪ হাজার ৮৩০ ভোট।সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভোট দেবেন উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে। এই কেন্দ্রে মাস্টারদা সূর্য সেন হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ও কবি জসীমউদ্দীন হলের মোট ৬ হাজার ১৫৫ শিক্ষার্থী ভোট দেবেন। ভূতত্ত্ব বিভাগ কেন্দ্রে ভোট দেবেন কবি সুফিয়া কামাল হলের ৪ হাজার ৪৪৩ জন ছাত্রী। আর ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে শামসুন নাহার হলের ৪ হাজার ৯৬ জন ছাত্রীর ভোটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আজ সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। ক্যাম্পাসের পরিবেশ যেন একেবারেই উৎসবের মতো। হলের আঙিনা, টিএসসি, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির আশপাশ—সব জায়গাতেই শিক্ষার্থীদের ভিড়, হাসি-আড্ডা আর উচ্ছ্বাস। অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীও আজকের দিনে ক্যাম্পাসে এসেছেন সেই পুরোনো নির্বাচনী স্মৃতি রোমন্থন করতে। সন্ধ্যার পর ফল ঘোষণার অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা আরও উৎফুল্ল হয়ে উঠবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জয়-পরাজয় যাই হোক, ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ক্যাম্পাসে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। ঢাকসু নির্বাচন শুধু প্রার্থীদের জন্যই নয়, বরং গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের জন্য এক গণতান্ত্রিক উৎসব। আজকের এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে—শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা কখনো স্তব্ধ হয় না, সুযোগ পেলেই তারা গণতন্ত্রের মঞ্চে নিজেদের অবস্থান জানান দেন।

0 মন্তব্যসমূহ