গতকাল রাজধানীতে বিশ্বব্যাংক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও বৈষম্য বিশ্লেষণ, সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ও নীতি–বিশ্লেষকেরা বলেন, সাম্প্রতিক প্রবণতা উদ্বেগজনক, কারণ এটি কোনো আকস্মিক পরিবর্তন নয় বরং ধারাবাহিক অবনতির প্রতিফলন।
হোসেন জিল্লুর রহমান (ছবি:সংগৃহীত)দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়–ব্যয় জরিপ (২০২২) অনুসারে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাংক মাইক্রো-সিমুলেশন মডেলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবাহ, শ্রমবাজারের পরিবর্তন, প্রবাসী আয় ও সরকারি ভর্তুকির ওপর ভিত্তি করে নতুন হিসাব তৈরি করেছে। তাদের মতে, দারিদ্র্যের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে— পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, চাকরি হারানো, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, মজুরি স্থবিরতা।এতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখে।
২০২৩–২৪ সালে প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে এবং ২০২৫ সালে আরও ৮ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এই ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে নারী ও তরুণ শ্রমশক্তিতে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০১৬ সালের পর থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় অংশই কৃষিখাতে। বছরে গড়ে যে ১৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, তার ৬৩ শতাংশ এসেছে কৃষি থেকে—যা স্বল্প আয়ের খাত। ফলে শহুরে অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি প্রায় স্থবির।
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকার সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বাড়ালেও প্রকৃত দরিদ্ররা কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাচ্ছে না। দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারের মাত্র অর্ধেক সরকারি সামাজিক সহায়তার আওতায় এসেছে অথচ ধনীর ২০ শতাংশ পরিবারের ৩৫ শতাংশ এসব সুবিধা পেয়েছে উপকারভোগী বাছাইয়ের দুর্বলতা ও ভর্তুকির বণ্টন–ত্রুটিকে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি:
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের অর্জনকে বিপন্ন করতে পারে—এমন সতর্কবার্তাও দিয়েছে
বিশ্বব্যাংক। তাদের
হিসাব, ২০৫০ সাল নাগাদ
১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ
বাস্তুচ্যুত হতে
পারে। কৃষিখাতে জিডিপির এক–তৃতীয়াংশ পর্যন্ত
ক্ষতি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে,
জলবায়ু–ঝুঁকি গ্রামীণ দরিদ্র
পরিবারগুলোর ওপর অসামঞ্জস্যভাবে প্রভাব
ফেলবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য
বাড়িয়ে তুলবে।
তিন সময়ের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যের গতি: অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বিশ্লেষণ করে বলেন— ২০১০–২০১৬: পুরোনো প্রবৃদ্ধি–কেন্দ্রিক গতিময়তার ধারাবাহিকতা।২০১৬–২০২২: দারিদ্র্য হ্রাসে গতি কমে যায়; ঋণনির্ভর অবকাঠামো, দুর্নীতিনির্ভর প্রণোদনা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় ২০২২–২০২৫ স্পষ্টভাবে ‘পিছুটান বা উল্টো ঘুরে যাওয়ার সময়কাল।তিনি প্রশ্ন তোলেন, এলডিসি উত্তরণ, মধ্যম আয়ের লক্ষ্য ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত।
চারটি নীতিগত সুপারিশ:দারিদ্র্য মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক চারটি অগ্রাধিকারমূলক দিক তুলে ধরে—
1. উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থানের ভিত্তি শক্তিশালী করা
2. দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য শোভন কাজের সুযোগ বাড়ানো
3. গ্রামীণ দরিদ্রদের জন্য কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা
4. সমতাভিত্তিক ও দক্ষ রাজস্বনীতি প্রণয়ন


0 মন্তব্যসমূহ