HEADER ADD

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে

 

রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া এক সপ্তাহের সময়সীমা আজ শেষ হচ্ছে। কিন্তু সময়সীমা শেষ হলেও দলগুলোর মধ্যে এখনো কোনো সমঝোতা গড়ে ওঠেনি। ফলে সংকট নিরসনের দায়িত্ব এখন সরকারের হাতেই—রাজনীতির ভাষায়, “বল এখন সরকারের কোর্টে”।

সরকারের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রাক্কালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে কোনো ঐকমত্য হয়নি। জামায়াতের দাবি, তারা বিএনপিকে আলোচনায় আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু বিএনপি সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব সরকারেরই।

এ অবস্থায় বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চেষ্টা চালালেও তা ব্যর্থ হয়েছে। এখন দলগুলোও চায়—উদ্যোগ নিক সরকারই।

 সরকারের অবস্থান: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্তে না এলে সরকারই দেশ ও জনগণের স্বার্থে পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, “সময় শেষ হওয়ার পর উপদেষ্টারা আলোচনা করবেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনীতিতে একদিনও অনেক সময়। আমরা আশাবাদী যে শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো না কোনো সিদ্ধান্তে আসবে। প্রয়োজনে সরকার অতিরিক্ত সময়ও দিতে পারে।”

 দলগুলোর অবস্থান: বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সরকার এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের মধ্যে অমিল থাকায় সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি দাবি করছে—যতটুকু ঐকমত্য হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে, আর যেগুলোতে মতভেদ রয়েছে তা জনগণের কাছে গণভোটের মাধ্যমে যেতে হবে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর মতে, আলোচনার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা বিএনপিকে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানিয়েছি, তারা আগ্রহ দেখায়নি। এখন সরকারের পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”

এনসিপি ও তাদের সহযোগী কয়েকটি দলও মনে করছে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা: সরকারি সূত্র বলছে, রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি ও ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ বিশ্লেষণ করে সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাব তৈরি করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

তবে গণভোটে কোনো দলের “নোট অব ডিসেন্ট” (ভিন্নমত) উল্লেখ থাকবে না। পাশাপাশি, ঐকমত্য কমিশনের দেওয়া ২৭০ দিনের বাধ্যবাধকতাও বাতিল করা হতে পারে। এছাড়া সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতামত: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এখন সময়ের দাবি। সরকারকেও নিরপেক্ষ ও সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. একেএম শাহনওয়াজ মনে করেন, “দলগুলোকে একমত করা কঠিন হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল তাদের কাছাকাছি আনা। এখন সরকার যদি একতরফা সিদ্ধান্ত দেয়, তা হবে আত্মঘাতী পদক্ষেপ।”

 বিরোধ বাড়ছে দুই দলের মধ্যে: জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াত এখন কার্যত মুখোমুখি অবস্থানে। উভয় দলই গণভোটের পক্ষে হলেও বিএনপি চায় গণভোট জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে হোক। তারা চায় গণভোটে দলের ভিন্নমতের বিষয়গুলো উল্লেখ থাকুক।

অন্যদিকে জামায়াতের অবস্থান, গণভোট হতে হবে জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং তাতে কোনো দলের ভিন্নমত প্রকাশ করা যাবে না।

এই দাবিতে জামায়াতের নেতৃত্বে আটটি ইসলামি দল সরকারকে শুক্রবার পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়েছে এবং ১১ নভেম্বর ঢাকায় বড় জনসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কোন পথে যাবে, তা এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সময়সীমা শেষ, আলোচনার ফল শূন্য—এ অবস্থায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ