স্কুল ভর্তিতে লটারি নাকি পরীক্ষা—কোন পদ্ধতি বেশি কার্যকর ?
দেশের স্কুল ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি ও ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। দুটি পদ্ধতিরই নিজস্ব সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একদিকে লটারি পদ্ধতি ছোট শিশুদের ওপর থেকে পরীক্ষার অতিরিক্ত চাপ কমায় এবং সকল আবেদনকারীকে সমান সুযোগ দেয়। অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং যোগ্য শিক্ষার্থীদের নির্বাচনের সুযোগ তৈরি করে।
Ø লটারি পদ্ধতির সুবিধা
লটারি পদ্ধতির অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি শিশুদের জন্য চাপমুক্ত। খুব অল্প বয়সে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অনেক শিশুকে মানসিক চাপের মধ্যে পড়তে হয়, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। লটারির মাধ্যমে সেই চাপ অনেকটাই কমে যায়।
এ ছাড়া এই পদ্ধতিতে ধনী-গরিব বা কোচিং-নির্ভরতার ভেদাভেদ কম থাকে। সবাই সমানভাবে সুযোগ পায় বলে অনেক অভিভাবকের কাছে এটি একটি ন্যায্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়। ভর্তি পরীক্ষা না থাকায় কোচিং সেন্টার বা গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীলতাও কমে যায়।
Ø বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্কুল ভর্তিতে পরীক্ষা না নেওয়ার যৌক্তিকতা:
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে স্কুল ভর্তিতে ভর্তি পরীক্ষা চালু করা অনেক ক্ষেত্রেই অসঙ্গত বলে মনে হয়। দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেক পরিবারই এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সন্তানের পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত কোচিং বা প্রাইভেট শিক্ষকের ব্যবস্থা করা বহু পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ভর্তি পরীক্ষা চালু থাকলে সাধারণত অভিভাবকদের সন্তানদের কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। কারণ ভালো ফল করার জন্য বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু সব পরিবার সেই খরচ বহন করতে পারে না। ফলে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায়, আর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
এতে করে শিক্ষাব্যবস্থায় এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শুধুমাত্র আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। অথচ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছোট বয়সে ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতা শিশুদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। খুব অল্প বয়সেই পরীক্ষার প্রস্তুতি, কোচিং এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশ তাদের স্বাভাবিক শৈশব ও মানসিক বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা না নিয়ে লটারির মতো সমান সুযোগভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা অধিক যুক্তিযুক্ত হতে পারে। এতে করে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থী সমানভাবে ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে এমন একটি পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন, যা সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে।
Ø ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির সুবিধা
অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের একটি সুযোগ তৈরি করে। এতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পায়। একই সঙ্গে স্কুলগুলোও তুলনামূলকভাবে প্রস্তুত ও সক্ষম শিক্ষার্থী পায়, যা শিক্ষার মান ধরে রাখতে সহায়তা করে।
লটারি পদ্ধতিতে অনেক সময় ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে ভর্তি হতে হয়। ফলে কখনো কখনো অপ্রস্তুত শিক্ষার্থীও ভালো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেয়ে যায়, যা পরীক্ষা পদ্ধতিতে অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।
Ø ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির অসুবিধাসমূহ
স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করার কিছু সুবিধা থাকলেও এ পদ্ধতির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাও রয়েছে। প্রধান অসুবিধাগুলো হলো—
১. শিশুদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ:
ছোট বয়সেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অনেক শিশুকে মানসিক চাপের মধ্যে পড়তে হয়। পড়াশোনা, কোচিং ও প্রতিযোগিতার চাপ তাদের স্বাভাবিক শৈশবকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
২. কোচিং বাণিজ্যের বিস্তার:
ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে অনেক ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়। এতে শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় বাণিজ্যিক হয়ে ওঠে।
৩. আর্থিক বৈষম্য বৃদ্ধি:
যেসব অভিভাবক কোচিং বা অতিরিক্ত প্রস্তুতির খরচ বহন করতে পারেন, তাদের সন্তানরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায়। ফলে দরিদ্র বা নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়তে পারে।
৪. প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির ঝুঁকি:
ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের সময় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম বা অন্য ধরনের দুর্নীতির ঝুঁকি থাকতে পারে, যা পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারে।
৫. সাময়িক পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভরতা:
অনেক সময় একটি দিনের পরীক্ষার ফলাফলের ওপর শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। কিন্তু একটি পরীক্ষা সব সময় শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা বা সম্ভাবনা পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না।
৬. মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি:
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অনেক সময় মুখস্থ পড়ার প্রবণতা বাড়ে। এতে সৃজনশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক শেখার চেয়ে পরীক্ষায় ভালো করার প্রবণতাই বেশি গুরুত্ব পায়।
Ø সারসংক্ষেপ:
ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থী বাছাইয়ের একটি উপায় হলেও এর সঙ্গে যুক্ত চাপ, কোচিং নির্ভরতা ও বৈষম্যের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে পদ্ধতিটি আরও স্বচ্ছ ও শিশুবান্ধব করা প্রয়োজন। শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুদের মানসিক বিকাশ ও শিক্ষার মান—এই দুই দিক বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভর্তি পদ্ধতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

0 মন্তব্যসমূহ