HEADER ADD

শারদীয় দুর্গাপূজা উৎসবে বাংলাদেশ

 

শারদীয় দুর্গাপূজা  উৎসবে বাংলাদেশ

 

সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে নীল আকাশে, শরতের হাওয়ায় কাশফুল দুলছে দোল খেয়ে যেন বাংলার প্রকৃতির আপন সাজ এমন মনোরম ঋতুতেই বাঙালির প্রাণের উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা আসে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবেই নয়, দুর্গাপূজা এখন হয়ে উঠেছে সামগ্রিক বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, যার আবেগ, রং, ছন্দ ঐতিহ্য মিশে আছে প্রত্যেক মানুষের মনে


২০২৫
সালের শারদীয় দুর্গাপূজা : দেবীর আগমন গমন

বাংলার আকাশে শরতের সাদা মেঘ ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ২০২৫ সালেও পূজার দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে শাস্ত্রমতে বছর দেবীপক্ষ শুরু হবে -২২ সেপ্টেম্বর, সোমবার, প্রতিপদ তিথি থেকে সেদিন থেকেই শারদীয় নবরাত্রি পালিত হবে

পূজার তিথি (২০২৫) : মহাষষ্ঠী: ২৮ সেপ্টেম্বর, রবিবার, মহাসপ্তমী: ২৯ সেপ্টেম্বর, সোমবার, মহাষ্টমী: ৩০ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার ,মহানবমী: অক্টোবর, বুধবার ,বিজয়া দশমী: অক্টোবর, বৃহস্পতিবার

দেবীর আগমন: শাস্ত্র মতে দেবীর আগমন নির্ভর করে সপ্তমীর বার অনুযায়ী ২০২৫ সালে সপ্তমী পড়েছে সোমবার ফলে মা দুর্গা বছর আসবেনগজ বা হাতিতে চড়ে’ হাতি দেবীর অন্যতম উৎকৃষ্ট বাহন পুরাণ মতে, দেবীর আগমন যদি হাতিতে হয়, তবে পৃথিবী ভরে ওঠে সুখ, শান্তি সমৃদ্ধিতে ভক্তদের মনোবাসনা পূর্ণ হয়, সমাজে আসে কল্যাণের বার্তা প্রকৃতিতেও আসে ভারসাম্যঅতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি নয়, ঠিক যতটা প্রয়োজন ততটাই বৃষ্টি হবে

দেবীর গমন :দশমীর দিনে দেবীর গমন নির্ধারিত হয় সেই দিনের বার অনুসারে ২০২৫ সালের বিজয়া দশমী পড়েছে বৃহস্পতিবার ফলে বছর দেবী বিদায় নেবেন  -দোলা বা পালকিতে চড়ে শাস্ত্রে বলা হয়েছে— “দোলায়াং মকরং ভবেৎঅর্থাৎ পালকিতে দেবীর গমন শুভ নয় এর ফলে দেখা দিতে পারে মহামারী, ভূমিকম্প, খরা, যুদ্ধ কিংবা অকালমৃত্যুর মতো আশঙ্কা তাই ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করবেন, যেন সব অশুভ প্রভাব থেকে পৃথিবী রক্ষা পায়

উৎসবের বার্তা: আগমন গমনের এই বার্তাই পূজার অন্যতম তাৎপর্য মা দুর্গার আগমন আনন্দ, সমৃদ্ধি আশীর্বাদ বয়ে আনে আবার বিদায় বেলায় তিনি ভক্তদের মনে সতর্কতার সঙ্কেত দিয়ে যান, যাতে মানুষ সৎপথে থাকে এবং একে অপরের কল্যাণে কাজ করে

শারদীয় দুর্গাপূজা তাই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি ভবিষ্যৎ ভাবনার প্রতিফলন ২০২৫ সালের পূজা আসুক নতুন আশার আলো ভক্তদের জন্য শান্তির বার্তা নিয়ে

উৎসবের আবহ: ঢাকের আওয়াজে যখন চারদিক মুখর হয়ে ওঠে, তখন শুধু পূজামণ্ডপ নয়, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি প্রান্তই আনন্দের রঙে রাঙিয়ে ওঠে নতুন পোশাকের ঝলক, রঙিন আলোকসজ্জা, মণ্ডপে মণ্ডপে শিল্পীদের সৃষ্টিশীলতার ছোঁয়া আর ভক্তির উচ্ছ্বাসসব মিলিয়ে দুর্গাপূজা হয়ে ওঠে এক অনন্য উৎসব পূজার দিনে গ্রামীণ বাজার থেকে শুরু করে নগরীর বিপণিবিতান পর্যন্ত মানুষে মানুষে ভরে ওঠে শিশুদের কোলাহল, তরুণদের আড্ডা আর বয়স্কদের গল্পে মেতে থাকে উৎসবমুখর পরিবেশ

 দেবী দুর্গা প্রতীকী বার্তা: দেবী দুর্গা শক্তি ন্যায়ের প্রতীক তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির বিজয় ঘোষণা করেন মহিষাসুর বধের কাহিনি আসলে অন্ধকারের ওপর আলোর জয়, অমানবিকতার ওপর মানবিকতার জয় এবং অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের জয়কে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে তাই পূজামণ্ডপে দেবীর প্রতিমা শুধু শিল্পকর্ম নয়, এটি মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয় অশুভকে পরাজিত করে সুন্দর সমাজ গড়ার

সংস্কৃতি সামাজিকতা: বাংলাদেশে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয় এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক সম্প্রীতির সেতুবন্ধন মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিষ্টানসব ধর্মের মানুষ মিলে মণ্ডপ পরিদর্শনে যান, একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান এভাবেই পূজা গড়ে তোলে সৌহার্দ্য ভ্রাতৃত্বের এক অসাধারণ পরিবেশগ্রামে গ্রামে দুর্গাপূজার আয়োজন হয় স্থানীয় সহযোগিতায় তরুণ-তরুণীরা স্বেচ্ছাশ্রমে মণ্ডপ সাজায়, নাটক মঞ্চায়ন করে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে শহরে আবার প্রতিযোগিতা হয় মণ্ডপ সাজানোর, প্রতিমা তৈরির বা আলোকসজ্জার সৌন্দর্যে এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী শিল্প সৃজনশীলতা

অর্থনৈতিক প্রভাব: দুর্গাপূজা দেশের অর্থনীতিতেও প্রাণ সঞ্চার করে পোশাক ব্যবসা, শাড়ি-পাঞ্জাবি বিক্রি, মিষ্টির দোকান, আসবাবপত্রের শোরুমসবখানেই জমে ওঠে বেচাকেনা শিল্পী, মৃৎশিল্পী, আলোকসজ্জাকারী, ঢাকিরা পান কাজের সুযোগ শুধু পূজার জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রতিমা বানাতে, মণ্ডপ সাজাতে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যুক্ত থাকেন ফলে উৎসব দেশের ক্ষুদ্র অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

গ্রাম শহরের ভিন্ন আবহ: গ্রামে পূজা মানে সহজ-সরল আনন্দ বাঁশ দিয়ে তৈরি মণ্ডপ, গ্রামীণ শিল্পীদের হাতে গড়া প্রতিমা, ঢাক-ঢোল আর শঙ্খধ্বনির মিলনসবকিছু এক আন্তরিক আবহ তৈরি করে শহরে আবার পূজা হয় বড় আকারে, যেখানে থাকে আধুনিক আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কখনো কখনো জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীদের পরিবেশনা তবে গ্রাম হোক বা শহর, মূল আনন্দ একটাইসবাইকে একত্রে যুক্ত করা

ভাসান বিদায়বেলা:পূজার শেষ দিন বিজয়া দশমী এদিন দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হয় বিসর্জনের সময় নদী বা পুকুরপাড় ভরে ওঠে মানুষের ভিড়ে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাকের তালে তালে প্রতিমা ভাসানো হয় সেদিন মানুষের চোখে থাকে আবেগ, বিদায়ের বেদনা তবে সঙ্গেই থাকে নতুন করে আবার দেবী আসবেনএই আশার আনন্দ

 

সম্প্রীতির বার্তা: বাংলাদেশের দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সামগ্রিকভাবে একটি সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির উৎসব উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষ ভুলে যায় বিভাজন, ভ্রাতৃত্বে মিলেমিশে আনন্দে মাতোয়ারা হয় যেন বাঙালির ঐক্যের প্রতীক

শারদীয় দুর্গাপূজা আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম বড় উৎসব এটি ধর্মীয় আচার, শিল্প, অর্থনীতি, সামাজিকতা সম্প্রীতিসবকিছুকে একত্রে বেঁধে দেয় সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা আর ঢাকের বাজনায় শারদীয় পূজা প্রতিবারই বাঙালির মনে নতুন করে আনন্দের রঙ ছড়িয়ে দেয় তাই এই উৎসব কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের নয়, সমগ্র বাঙালির

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ