HEADER ADD

উচ্চকক্ষ গঠনে পিআর পদ্ধতি


সংবিধান সংশোধনের ৪৫ দিনে বাস্তবায়ন, উচ্চকক্ষ গঠনে পিআর পদ্ধতি

 প্রধান উপদেষ্টার কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ জমা : সংবিধান সংস্কারের জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ২৭০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে সংবিধান সংশোধন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। এরপর ৪৫ দিনের মধ্যে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত এই সুপারিশ মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তিন ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হবে— নির্বাহী আদেশ, অধ্যাদেশ এবং গণভোটের মাধ্যমে।

ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের জন্য এই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে হবে। এজন্য সরকারকে একটি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”

সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও গণভোট: সুপারিশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে।

কমিশনের প্রস্তাবে দুটি বিকল্প প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে। প্রথম বিকল্পে বলা হয়েছে, গণভোটের আগে জনগণের সামনে একটি খসড়া সংবিধান সংস্কার বিল উপস্থাপন করা হবে। দ্বিতীয় বিকল্পে এই ধাপটি রাখা হয়নি। গণভোটে জনগণের সম্মতি পেলে সংসদ ওই বিল অনুমোদন করবে।

পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন: কমিশনের অন্যতম প্রস্তাব হলো, সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা। জনগণের সম্মতি পেলে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৪৫ দিনের মধ্যে এই কাঠামো কার্যকর করা হবে।

তিন ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা: কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়, জুলাই সনদের ৮৪টি সুপারিশের মধ্যে ৯টি বিষয় নির্বাহী আদেশেই বাস্তবায়নযোগ্য। যেমন— বিচার বিভাগে জনবল বৃদ্ধি, জেলা আদালত সম্প্রসারণ, কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠন, দুর্নীতিবিরোধী কৌশল প্রণয়ন, আদালত ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন ইত্যাদি।

এছাড়া কিছু প্রস্তাব অধ্যাদেশের মাধ্যমে এবং সংবিধান সংশোধনের ৪৮টি প্রস্তাব গণভোটের মাধ্যমে কার্যকর হবে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া: সুপারিশ গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন জাতিকে অতীতের বোঝা থেকে মুক্ত করবে এবং নতুন বাংলাদেশের পথ দেখাবে। এই কাঠামো যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।”

তিনি ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “তাদের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই আজ আমরা একটি ঐতিহাসিক দিন প্রত্যক্ষ করছি।”

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: সুপারিশে আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “গণভোট নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট— নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে, পৃথক ব্যালটে হবে।”

অন্যদিকে, বিএনপির আরেক নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সুপারিশে এমন কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে, যা কমিশনের টেবিলে আলোচিত হয়নি।”

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী চায় নভেম্বরে গণভোট অনুষ্ঠিত হোক। দলের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “নভেম্বরের মধ্যে গণভোট দিতেই হবে, নইলে জুলাই সনদ কার্যকর হবে না।”

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, “আমরা সুপারিশগুলো ইতিবাচকভাবে নিয়েছি। নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই গণভোটে প্রস্তাব উপস্থাপন করার বিষয়টি আমাদের দাবির সঙ্গে মিলে গেছে।”

সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ফলাফল: জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারবেন না এবং তার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারিত হবে। রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। আইনজীবী সংগঠনগুলো দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকবে, আর সংসদ সদস্যরা বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য বিষয়ে দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন।

গণভোটে জনগণের মতামতই চূড়ান্ত: কমিশন জানিয়েছে, গণভোটে জনগণ যদি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে প্রক্রিয়া সেখানেই বন্ধ হয়ে যাবে। আলী রীয়াজ বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ সচেতন; তারা গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

 নিউজ ডেস্ক | ২০২৫


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ